লাইটটা জ্বালতে গিয়েও সুইচ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন ডা. সাইমুম। কমলা একদম আলো সহ্য করতে পারে না। আলো জ্বাললেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। লাফ দিয়ে দিয়ে দেয়ালের উপর আছড়ে পড়তে থাকে। তাই লাইট না জ্বালিয়েই ধীরে ধীরে আবছা আলোর ঘরটাতে প্রবেশ করলেন ডা.। কমলাকে ঘরের কোণটায় শান্তভাবে বসে থাকতে দেখে বের হয়ে এলেন।
এই তের মাসে বলতে গেলে তেমন কোন উন্নতিই হয় নি কমলার। এখনো চার হাত পায়েই হাঁটে, হাত ছাড়াই কামড়ে খাবার খায়, জিহ্বা দিয়ে চেটে চেটে পানি খায়। কাপড়-চোপড় এখনো পড়ানোই যায় নি।
তের মাস আগে যখন ওকে দিগুভামুট্টার পাশের জঙ্গলের শেয়ালের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় তখন যেমন ছিল এখনো তেমনি। চেহারাতেই শুধু মানুষের আকৃতি; সমস্ত আচরন, অভ্যাস সবকিছু একদম চতুষ্পদ জন্তুর মত। যখন ওকে উদ্ধার করে ডা. সাইমুম তখন ওর বয়স আনুমানিক ষোল বছর। একটা বাচ্চা, যে কিনা তার জীবনের ষোলটা বছর কাটিয়েছে শেয়ালের সাথে তার আচরনগুলো চতুষ্পদ জন্তুর মত হবে এটাই স্বাভাবিক। মাস তের আগে খোঁজ পেয়ে ওকে তুলে নিয়ে আসে মনোবিজ্ঞানি ডা. সাইমুম। নিজের বাসায় রেখে অনেক যত্ন করে তাকে ধীরে ধীরে মানুষ করে নেবার চেষ্টা করছে ডা. সাইমুম। কাজটা খুবই কষ্টের। যে আজন্ম কোন মানুষের সংষ্পর্শ পায় নি তাকে প্রত্যেকটা মনুষ্য আচরন শেখাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। বলতে গেলে কোন উন্নতিই হচ্ছে না। তবে একটা আচরনে পরিবর্তন এসেছে কিছুটা। আগে তো খাবার দিতে গেলেও কামড় দিতে আসতো। এখন আর আগের মত অতটা আক্রমনাত্নক আচরন করে না। কিন্তু সে ধারনাটাই কাল হল ডা. সাইমুমের জন্য শেষ পর্যন্ত।

আরো কিছুদিন পরে কমলাকে খেতে দিলে চুপচাপ খায়, ডাক দিলে কাছে এসে উবু হয়ে বসে থাকে, এমনকি গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিলেও ছুঁড়ে ফেলে দেয় না। ডা. সাইমুম ভাবলেন কমলার ভেতর থেকে পশুসুলভ আক্রমণাত্নক ভাবটা তিনি কাটাতে পেরেছেন। এখন শুধু মানুষের কালচারটাই ওকে শেখাতে হবে এই যা। হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু তিনি পারবেন তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। আর তিনি চরম একটা ভুল করে বসলেন।

সেদিন ডিউটিতে যাবার জন্য বের হচ্ছিলেন ডা. সাইমুম। তাঁর তিন বছরের পিচ্চি ছেলেটা হয়েছেও একটা। প্রচন্ড জেদী। অফিস যাবার সময় ওকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি না করলে ছাড়বেই না। ছেলেটাকে কোলে নিয়ে ভাবলেন কমলার ঘর থেকে একটা বার ঘুরে আসা যাক।
কমলা তো এখন আলোতে দিব্যি থাকে। সকালের নাস্তা ওকে আগেই দেয়া হয়েছিল। নাস্তা খেয়ে লক্ষ্ণী মেয়ের মত প্লেট এক সাইডে সরিয়ে রেখেছে। দেখে মন ভরে গেল ডাক্তারের।
কমলার ঘরের সাথে একটা ব্যালকোনি আছে। দরজাটা সব সময়ই বন্ধ থাকে। ডাক্তার ভাবলেন আজ থেকে তিনি ওটা খুলে দিলে মন্দ কি। কমলা মন চাইলে ব্যালকোনিতে গিয়েও এখন বসে থাকতে পারবে। বাইরের দিকটা দেখতে পাবে।
ছেলেটাকে কোল থেকে নামিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন। একবার শুধু চেক করে দেখতে চাইলেন ব্যালোকোনির গ্রীলটা ঠিকঠাক আছে কি না। কোনটা ভেঙ্গে যেন আবার কমলা বের হয়ে না যায়।
ঠিক এই সময়ই ঘটনাটা ঘটল। ভিতর থেকে তার তিন বছরের বাচ্চাটা চিৎকার দিয়ে উঠলো। ব্যালকোনি থেকে এক দৌড়ে ডাক্তার ঘরে এলেন ডাক্তার। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। তাঁর তিন বছরের বাচ্চা ছেলেটা মেঝেতে পড়ে আছে। কমলা ওর গলাটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে রক্ত আর সেটা জিহ্বা দিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছে কমলা।
আরেকটা দৌড় দিলেন ডা.। ড্রয়ার থেকে পিস্তলটা নিয়ে এলেন। কমলার মাথা সোজা করে ট্রিগারটা টিপে দিলেন।

ফেরেল মানব কি?

Facebook Comments
Share: