১.
তুহিন আপু আর আমি পাশাপাশি হাঁটছি। আপু বকবক করছে আর আমি শুনে যাচ্ছি।
– কী রে তুই নাকি পিকনিকে যাবি না?
– হুমম
– কেন, তুই যাবি না কেন?
– কাকু বলল তোমাকে নাকি যেতে দেবে না। তুমি না গেলে আমিও যাব না।
– ও…..
আপুর আবার বকবকানি শুরু হয়ে গেলো। এতো কথা বলতে পারে আপু! আর আপুর কন্ঠটা যেন ঝনঝন করে। মুগ্ধ হয়ে আমি আমি আপুর কথা শুনতে থাকি। আপু হঠাৎ ঝাড়ি দিয়ে ওঠে।
– এই কথা বলার সময় তুই অমন হা করে চেয়ে থাকিস কেন রে? সারাজীবন হ্যাবাকান্ত হয়ে থাকবি নাকি?! চালাক হবি কবে?!
আমি ভীষণ লজ্জা পাই। মুখ ঘুরিয়ে মাথা নিচু করি।
মাস চারেক হল আমি ডিউটিটা পেয়েছি। প্রতিদিন সকাল বেলা স্কুলে যাবার সময় আপুকে নিয়ে যাওয়া, আর ফেরার সময় সাথে করে নিয়ে আসা।
আপুর চোখগুলো একদম ডাগর-ডাগর, চুলগুলো কোমর পর্যন্ত, একদম সিল্কি, আর গায়ের রংটা দেখলেই মনে হবে কেউ যেন হলুদ মেখে দিয়েছে। দেখেই দুষ্টু ছেলেদের মাথা ঘুরে যায়। তাই আমাকে আপুর সিকিউরিটির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
আপু বলে, জানিস ওরা আমাকে একলা পেলে একদম চেটে চেটে, কামড়ে খাবে।
আমি খুব লজ্জা পেয়ে যাই। আপু খুবই মুখভাঙ্গা!
প্রায় রোজই যাবার সময় দেখি পাঁচটা সাতটা দুষ্টু ছেলে ব্রিজটার উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আসামাত্র কেউ শীষ দেয়, কেউ গান গায়, কেউ নানান কথা বলে আপুকে। মাঝে মাঝে আমাকেও বলে।

সুন্দরী তুহীনের
পিচ্চি সিকিউরিটি
পিচ্চির পকেটত
পিস্তল কুটি*

ওরা যা বলে সব আমার রেকর্ড করে ফেলতে হয় আর বাড়ি ফিরে বড় কাকুকে সব বলে দিতে হয় আমার। আপাতত এটাই আমার ডিউটি।

২.
এই আপাত সরল ডিউটিটাই শেষ পর্যন্ত আমার সর্বনাশ ডেকে আনল।
ইদানিং বিষয়টা টের পাচ্ছি। রাত যত বেশি হয় তত কেন জানি তুহিন আপুর কথা মনে পড়ে। পড়তে বসলে কেন জানি বইয়ের পৃষ্ঠায় তুহিন আপুর মুখটা ভেসে ওঠে। আপুকে দেখতে না পেলে অস্থির লাগে। কেমন একটা চিনচিনে আনন্দ লাগে বুকের মধ্যে। ইদানিং সব কিছুতেই খুব ফুরফুরে লাগে আমার।
অবশেষে………….
অবশেষে আমি আবিস্কার করলাম আমি তুহিন আপুর প্রেমে পড়ে গেছি। হবে না???!!! আমার এখন চৌদ্দ চলছে….
আমিও স্পষ্ট বুঝতে পারি আপুও মনে মনে আমার কথা ভাবে। আমাকে অনেক পছন্দ করে। স্কুল থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে এসেই আমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। আমার হাত ধরে থাকে। মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করে, আমার কেমন মেয়ে পছন্দ, কবে বিয়ে করতে চাই।
আমার উত্তর দেয়াটা আর হয়ে ওঠে না, বলতে পারি না তোমাকেই আমার পছন্দ। শুধু আজকাল আপুর তুইতুকারিটা কেমন কেমন লাগে!
আমি বলতে না পারলেও করতে কম করি না। আপু কদম ফুলটার দিকে শুধু তাকালেই হয়েছে। আমি তরতর করে গাছে উঠে পেড়ে এনে দিই। আপু কাঁচা আম খেতে চায়। আমি বারোমাসি গাছ থেকে কাঁচা আম চুরি করে এনে দিই। আপু কাগনা খাবে, দুই-চারটা আস্ত কলার গাছ তুলে এনে দিই আর ভাবি মেয়েরা এত টক খায় কেন?
কিন্তু যেই আর সেই, আমার মনের কথাটা আর আপুকে বলা হয় না।

৩.
একদিন আপুই সুযোগটা করে দিল। স্কুল থেকে ফেরার সময় বলল, ফ্রেশ হয়ে দিঘীর শানবাঁধা ঘাটে আসবি, জরুরি কথা আছে।
আমি খুশিতে লাফাতে থাকি। আমি জানি আমার সাথে কী জরুরি কথা। আমি নিশ্চিত আপু আজকেই তার মনের কথা আমাকে জানাবে। আমার দু’টো হাত ধরে বলবে, আই লাভ ইউ মাইট!
আমি নিশ্চিত! আপু তো আর আমার মত মুখচোরা নয়।
আমি দৌড়ে বাড়ি আসি। কোনরকমে মুখে পানির ছিঁটে দিই। বইয়ের ভিতর থেকে চিঠিটা বের করে পকেটে পুরি। অনেক কষ্ট করে গুছিয়ে চিঠিটা লিখেছিলাম। আপু আই লাভ ইউ বলা মাত্র চিঠিটা বাড়িয়ে দেব। ছেলে হয়ে পিছিয়ে থাকলে কেমন হয়!
একদৌড়ে দিঘীর ঘাটে এসে পৌছুলাম। আপু পৌঁছুল দশ মিনিট পর।
– তুই তো অনেক চটপটে হয়েছিস রে। আগেভাগেই এসে পড়েছিস!
দুই জনে শানের উপর বসলাম।
আপু বলল, হাতটা বাড়িয়ে দে। আপু পাজামার পকেটে হাত ঢুকাল।
আমার অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। পকেট থেকে এখন গোলাপ অথবা চিঠি বের হবে। আমার কপাল ঘামতে শুরু করল। বুকের ভিতর কেউ যেন হাতুরি পেটাচ্ছে।
কিন্তু আপু পকেট থেকে ওটা কী বের করল! জিনিসটা আমার হাতে পরিয়ে দিল।
বলল, আমার তো নিজের ভাই নেই। তাই আজকে ভাই ফোঁটার দিনে তোকে আমি আমার ভাই করে নিলাম।
আমার মাথায় যেন একটা চক্কর দিল। আমি তো আর জানতাম না আজকে ভাইফোটা। আমার চিঠিটা পকেটেই পড়ে রইল।

*কোথায়

Facebook Comments
Share: